পোস্ট এডিট : এ কোন সমাজ!

চাপড়ার শিশুকন্যা কে ধর্ষণের অভিযোগ,গ্রেফতার কিশোর
SHARES
Share on FacebookShareTweet on TwitterTweet

রচনা মন্ডল : কেটে গেছে তিনটে বছর। রাশি রাশি বিক্ষোভ বা সমাবেশেও হয়নি নিষ্পত্তি। হয়তো এখনো আশঙ্কায় দিন কাটছে সেই শিশুর যাকে নিগৃহীত হতে হয়েছিল স্কুলেরই শিক্ষকদের হাতে, সেই তালিকাতেই যোগ হল আরো এক শিশুকন্যার। বয়স মাত্র চার। যে হয়তো সঠিক ভাবে ‘রেপ’ বা ‘ধর্ষণ’ শব্দগুলো উচ্চারণ ও করতে পারেনা। শুধু উচ্চারণ বলছি কেন মানেটাও হয়তো পরিস্কার নয় তার কাছে! হ্যাঁ সেই শিশুকন্যাকেই দুই শিক্ষকের যৌন লালসার শিকার হতে হল।

বিড়লা স্কুলে নিগৃহীত শিশুক
ছবি প্রতিকি

স্বাধীনতার ৪১ বছর পরেও বিকলাঙ্গ এই দেশ। যেখানে স্বাধীনতার স্বাদও বোঝা দুস্কর। প্রতিদিন সকালে বাড়ি থেকে বের হয়ে ঠিক মতো বাড়ি ফিরতে পারব কিনা সে বিষয়েও নিশ্চয়তা থাকে না। আর সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় বছর ৪ এর বাচ্ছাদের নিয়েও একই চিন্তায় তাদের পরিবার-পরিজন। বর্তমান পরিস্থিতিতে একটি কথা খুবই প্রাসঙ্গিক, “সাত কোটি সন্তানেরে হে মুগ্ধ জননী, রেখেছ বাঙালি করে মানুষ করনি”। বা একটু বদলে বলাই যায়,রেখেছ ‘শিক্ষক’ করে মানুষ করনি!!! তবে ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে বইকি।

অন্যদিকে ছেলেবেলা থেকেই বাচ্ছাদের শেখানো হয়, পড়াশোনা করে যে গাড়িঘোড়া চড়ে সে। সেই কথাকেই সত্যি করতে স্কুল, স্কুল থেকে কলেজে ভর্তি করেন অভিভাবকেরা। উদ্দেশ্য সুশিক্ষা গ্রহণ। অথচ শিক্ষাঙ্গনেই যদি একের পর এক শিক্ষার্থীকে যৌন নিগ্রহের শিকার হতে হয় তবে কেমন করে ভরসা করবেন শিক্ষীর্থী বা অভিভাবকেরা?

চাপড়ার শিশুকন্যা কে ধর্ষণের অভিযোগ,গ্রেফতার কিশোর
ছবি প্রতীকী

৩০শে নভেম্বরের ঘটনায় এখনো উত্তপ্ত শহরতলি। তবে শুধু উত্তপ্ত নয় আতঙ্কিত! যৌন নির্যাতনের শিকার হলো বছর চারের একটি শিশু তাও আবার কলকাতারই একটি অভিজাত স্কুলে।রানিকুঠীর জি.ডি.বিড়লা স্কুলে অন্যান্য দিনের মতই গিয়েছিল ছোট্ট শিশুটি। বিকেলে যখন বাড়িতে ফিরে আসে, মাকে বলে, যৌনাঙ্গে অসহ্য ব্যাথা। তার মায়ের বক্তব্য যৌনাঙ্গ দিয়ে রক্ত বেরোচ্ছিল। শিশুটিকে জিজ্ঞাসা করাতে জানা যায়, তাকে টয়লেটে নিয়ে যায় তার পি.টি. টিচার। তারপর অন্তর্বাস খুলে সোজা আঙুল নিয়ে শিশুটির যোনিপথে প্রবেশ করায়। শিশুটির বাবা মা নেতাজীনগর থানায় এই পুরো বিষয়টি জানিয়ে অভিযোগও দায়ের করেন।

প্রত্যেক বাবা-মা চান যে তার সন্তান সুপ্রতিষ্ঠিত একটি স্কুলে শিক্ষালাভ করুক। কিন্তু কলকাতার বুকে জি.ডি.বিড়লার মত প্রথম সারির স্কুলে এরকম ঘটনা যথারীতি কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে অভিভাবকদের।

শিশু পাচার কান্ডে নাম জড়াল বিজেপি নেত্রীর
ছবি প্রতীকী

বর্তমান আধুনিকতায় হোক কিংবা বিজ্ঞানের আবিষ্কারের সুবাদে বর্তমানে যে কোনও ঘটনার প্রতিবাদের মাধ্যম সোশ্যাল মিডিয়াই, তাই জি ডি বিড়লার ঘটনাও যে ব্যতিক্রম হবেনা সেটাই স্বাভাবিক। তবে এমন নিন্দাজনক ঘটনায় যেখানে মুখ ঢেকেছে মহানগরী যেখানে সোশ্যাল মিডিয়াতেই প্রতিবাদে সরব হয়েছেন বহু মানুষ, সেখানেই বেশ কিছু মানুষ স্কুলের পাশে এসেও দাঁড়িয়েছে। ‘‌পাশে আছি জি ডি বিড়লা’ নামের ফেসবুকের একটি গ্রুপের মূল উদ্দেশ্য কী তা এখনও বোঝা না গেলেও, স্কুলের মধ্যে ঘটে যাওয়া এই ঘৃণ্যতম অপরাধ তাদের কাছে নেহাতই হালকা। এই ঘটনায় স্কুলের কোনও দোষই নেই, এমনটাই দাবি তাঁদের। 

হ্যাঁ বলতেই পারেন স্কুলের দুই শিক্ষকের দায় সমগ্র স্কুলের হতে পারে না। কিন্তু এমন ঘটনার প্রতিবাদ না করে স্কুলেরই শিক্ষিকারা যদি বলেন, ‘কেউ যদি দুষ্টুমি করে কী করা যাবে?’ সেক্ষেত্রেও কী স্কুলের কোনো দায় থাকে না? বছর তিনের ঘটনার পুনরাবর্তন কী কোনোঅংশে স্কুলেরই গাফিলতিরই প্রমাণ দেয়না? এমন ঘটনার পরেও স্কুল কর্তৃপক্ষের উদাসীনতাও কী কাম্য?

শিক্ষকদের ঘেরাও, অবস্থান বিক্ষোভ, পথনাটিকা, ফেসবুক বাই লেন, যাদবপুর থানার সামনে সমাবেশ, ইত্যাদি নানান কর্মকান্ডের পরেও মেলেনি কোনো নিস্পত্তি। পরিবর্তে অনির্দ্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে গেছে স্কুল। স্কুলটি যে সংস্থার অধীনে রয়েছে তার মুখপাত্র সুভাষ মোহান্তি জানান, সকলের নিরাপত্তার জন্যই এই সিদ্ধান্ত। তবে স্কুল বন্ধ হলেই কী নিশ্চিত নিরাপত্তা মিলবে সে নিয়ে কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়..।

আবার অন্যদিকে অনির্দিষ্ট কালের জন্য স্কুল বন্ধ করে দেওয়ায় পড়ুয়াদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তো অনিশ্চয়তা তৈরি হলই তারই সাথে অসুবিধায় পড়তে হল পরীক্ষার্থীদের।

প্রসঙ্গত বছর তিন আগের এমন ঘটনায় স্কুল বন্ধের ঘোষণায় তাঁদের মধ্যে বিভাজন আনতে সক্ষম হয়েছিল স্কুল কর্তৃপক্ষ এবারেও তেমন চিত্র তৈরী করাই হয়তো মূল লক্ষ্য এমনটাই মনে করছেন অনেকে।

তবে এমন ঘটনা যে অত্যন্ত নিন্দনীয় তা যেমন বলার অপেক্ষা রাখে না ঠিক তেমনই স্কুল বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেলেই এই সমস্যার সমাধান ধটবে এমনটা নয়। অন্যদিকে মানুষের চরিত্র বুঝে শিক্ষকতার চাকরি দেওয়াও সম্ভব নয়। তবে করণীয় কী? কী ভাবে এমন অমানবিক ও নিন্দনীয় ঘটনাগুলির মোকাবিলা করা সম্ভব?

স্কুলে হওয়া অন্যায়ের ওপর আপনার হাত থাকে না কিন্তু আপনার সন্তান আপনার কাছেই থাকে সে কথাটা মনে রাখা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ।

• ব্যস্ততাময় জীবনের দরুণ আপনার সন্তানের সাথে মন খুলে কথা বলার অবকাশও মেলে না আপনার, আবার অবকাশ রয়েছে অথচ আপনার সন্তান মন খুলে সবটুকু বলতে পারছে না, এক্ষেত্রে গাফিলতিটা আপনার নয়তো প্রশ্ন করুন নিজেকে।

• আপনার সন্তানের সবটুকু ভার বেবিসিটারের ওপর না দিয়ে নিজেই তাকে স্কুলে দিয়ে আসা নিয়ে আসা করুন। দিনের কিছুটা সময় তার সাথে কাটান।

•আপনার সন্তান কে উচিত অনুচিত নানান কাজগুলি সম্পর্কে জানান। যাতে সে বুঝতে পারে কোনটা অন্যায়।

•শুধু অভিভাবক নয় তাদের বন্ধু হয়ে উঠুন। কারণ,হয়তো এমন ঘটনা দিনের পর দিন আপনার সন্তানের সাথে ঘটছে অথচ শুধুমাত্র তার ভয়ের কারণে সবটুকু অজানাই থেকে যাচ্ছে আপনার।

• স্কুলের প্রতিটি কোণায় সিসিটিভি ক্যামেরা লাগাতে হবে। রাখতে হবে মহিলা অ্যাসিসটেন্ট।

• শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জনসংযোগ ঘটাতে হবে। স্কুলের ভাবমূর্তি যে তাদেরই হাতে সেটা বোঝাতে হবে। সঠিক কাউন্সেলিং করানো প্রয়োজন।

তবে শিক্ষক মানেই খারাপ কিংবা পুরুষ মানেই খারাপ তাই আপনার সন্তানের তড়িঘড়ি সমস্ত শিক্ষক পালটে দেওয়ার বা পুরুষদের থেকে দূরে রাখার পন্থা মোটেই কোনো সমাধান নয়। এতে শিশুমনে বাড়তি চাপ ও ভীতিরই উদ্রেক হয়।

লালবাজারের তৎপরতায় ধর্ষণ আটকাল
ছবি প্রতীকী

আপনি প্রশ্ন করতেই পারেন কেন?

ধরুন আপনার সন্তানের ড্রইং বা গানের শিক্ষক তার খুব প্রিয়। এবং শুধুমাত্র পুরুষ হওয়ার জন্য তাকে বদলে ফেললেন আপনি। আপনার সন্তান আপনাকে জিজ্ঞাসা করতেই পারে তিনি কেন আসবেন না? অথচ আপনি তাকে সঠিক কারণটিও বলতে পারছেন না। তখন আপনাকে এমন কিছু বলতে হবে যেটা তার মনে ভয় তৈরী করবে। এটা কী বাড়তি চাপ নয়? একই অ্যাপার্টমেন্ট অথচ সমবয়সী ছেলে বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে মানা করেছেন, সেখানেও ভয় দেখাতে হয়েছে আপনাকে। কিন্তু সত্যিই কী এভাবে অন্যায় বন্ধ করা সম্ভব? পন্থা যাই হোক না কেন সমাজের মূলস্রোত থেকে আমরা কখনোই তাদের বঞ্চিত করতে পারিনা।

তবে বারংবার এমন ঘটনায় সরকারী ভূমিকা যে থেকেই যায় তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ৩০শে নভেম্বরের ঘটনার সম্পূর্ণ বিষয় কলকাতা হাইকোর্টের ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চে তুলে ধরেন আইনজীবী রমাপ্রসাদ সরকার। যেখানে একইসঙ্গে স্কুলের মধ্যে সিসিটিভি ক্যামেরা লাগানো এবং মেয়েদের শৌচালয়ে একজন করে মহিলা অ্যাটেনডেন্ট থাকা দরকার বলে দাবি জানান ওই আইনজীবী।

পুরুষাঙ্গ ছেদ শাস্তি হোক ধর্ষণকারীর
ছবি প্রতীকী

প্রয়োজনে নিয়মিত স্কুলে শিক্ষক ও অভিভাবকদের মিটিং এর আয়োজনও করার কথা মনে করছেন অনেক স্কুল কর্তৃপক্ষ।

তবে এত কিছুর পরেও এই ঘটনা হয়তো কয়েক বছর পর চাপা পড়ে যাবে, ঠিক যেমন ২০১৪র ১১ই নভেম্বরের ঘটনা চাপা পড়েই রয়ে গিয়েছিল। কিন্তু মাত্র বছর চারের এই শিশুকন্যার আশঙ্কাগ্রস্থ জীবন কী সত্যিই পাওনা ছিল? আমাদের আধুনিক ও শিক্ষিত সমাজ ,হ্যাঁ সো কলড আধুনিক ও শিক্ষিত সমাজের বোধহয় এই অধিকারটা ছিল না।

ADVERTISEMENT
ADVERTISEMENT

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *