ঘুষ না দেওয়ায় হাসপাতালে বিনা চিকিৎসায় মৃত রোগী, ধৃত স্টোর-কিপার

জাল ওষুধ চক্র গ্রাস করছে পুরো রাজ্য
SHARES
Share on FacebookShareTweet on TwitterTweet

তরুনা মণ্ডল

তরুণ রোগীর মস্তিষ্কে ছিল প্রাণঘাতী সমস্যা৷ তা নির্মূল করার জন্য প্রচুর অর্থের প্রয়োজন ছিল৷ বাজারে যেগুলির সম্মিলিত অর্থমূল্য প্রায় সাত লাখ টাকা হলেও সরকারি হাসপাতালে তা বিনামূল্যেই পাওয়ার কথা ছিল৷ কিন্তু স্টোর-কিপারকে লাখ দেড়েক টাকার ঘুষ না-দেওয়ায় তা পায়নি রোগীর পরিবার৷ চার মাসের উপরে কার্যত বিনা চিকিৎসায় ভর্তি থাকার পরে শেষে মৃত্যু হয় বছর ২৩ এর তরুণ অমিত মণ্ডলের৷ ঘটনাটি ঘটেছে স্নায়ু চিকিৎসার উৎকর্ষকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ‘বাঙ্গুর ইনস্টিটিউট অফ নিউরোসায়েন্সেস’ (বি আই এন) হাসপাতালে৷ পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে অভিযুক্ত স্টোর-কিপার পলাশ দত্তকে৷

গড়িয়ার কামডহরির বাসিন্দা ধনঞ্জয় মণ্ডল, তাঁর ছেলে অমিতকে হারান ২৭ এপ্রিল৷ স্বাভাবিক ভাবেই তাঁর পরিবারের সমস্ত ক্ষোভ উগরে পরে স্টোর-কিপার পলাশের উপরে৷ কিন্তু পরিবারের অভিযোগ, উল্টে সেই সরকারি কর্মীই হেনস্থা করেন শোকার্ত পরিজনদের৷ দু’দিন পরে এব্যাপারে তাঁরা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় ভবানীপুর থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন৷ প্রাথমিক তদন্তে অভিযোগের সত্যতা খুঁজে পাওয়ায় পরিবারের সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই শনিবার রাতে গ্রেপ্তার করা হয় অভিযুক্ত স্টোর কিপার পলাশকে৷ রবিবার বিকেলে তাঁকে আলিপুর পুলিশ আদালতে তোলা হলে বিচারক তাঁকে একদিনের জেল হেফাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন৷ সোমবার ফের পলাশকে আদালতে তোলা হবে৷

বি আই এন তথা পিজি’র অধ্যক্ষ অজয় রায় জানিয়েছেন, অভিযোগ তাঁর পেয়েই মনে হয়েছিল, এটি ফৌজদারি অপরাধ৷ তাই তিনি অভিযোগপত্রটি থানায় পাঠিয়েছেন৷ পুলিশ তাদের কাজ করেছে৷ চিকিৎসকদের একাংশ বলছেন, চুপিসাড়ে অনেক হাসপাতালেই স্টোর-কিপার ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর এহেন অমানবিক আচরণ ও লোভের শিকার হয়ে থাকেন বহু রোগী৷ মৃত্যু না হওয়ায় সেগুলির অধিকাংশ ধামাচাপা পড়ে থেকে যায়৷ ধনঞ্জয়ের অভিযোগ, ছেলের মৃত্যুর পর তাঁরা পলাশের সঙ্গে কথা বলতে গেলে পলাশ ও তাঁর সহকর্মীরা তাঁদের উপরেই চড়াও হন৷ পলাশ রীতিমতো হামলা চালান৷ এতে মণ্ডল দম্পতির জামাকাপড়ও ছিঁড়ে যায়৷ পুলিশ পলাশের বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৪১ (অন্যায় ভাবে বাধা দেওয়া), ৩২৩ (জখম করার উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃত আঘাত), ৩৫৪ (শ্লীলতাহানির উদ্দেশ্যে বলপ্রয়োগ) ও ১১৪ (সশরীরে প্রত্যক্ষ ভাবে অপরাধ করা) ধারায় এবং দুর্নীতিদমন আইনের ৭ (সরকারি কর্মীর ঘুষ নেওয়া) ধারায় মামলা রুজু করেছে৷

বিআইএনের চিকিৎসকদের থেকে জানা গিয়েছে, গত ২৫ জানুয়ারি অমিতকে ‘সেরিব্রাল অ্যানিউরিজম’-এর সমস্যা নিয়ে ভর্তি করা হয়েছিল৷ এই অসুখে মস্তিষ্কের কোনও একটি ধমনী বেলুনের মতো ফুলে থাকে৷ যে কোনও সময়ে সেটি ফেটে মৃত্যুও হতে পারে৷ অবিলম্বে অস্ত্রোপচার জরুরি৷ সেইমতো হাসপাতালের স্নায়ু-শল্য চিকিত্সক একটি স্টেন্ট, ১০টি কয়েল ও আনুষঙ্গিক চিকিৎসা সরঞ্জামের রিকুইজিশন দেন৷ বাজারে এমন এক একটি স্টেন্টের দাম প্রায় २ লাখ, এক-একটি কয়েলের দাম প্রায় ৪০ হাজার এবং আনুষঙ্গিক সরঞ্জামের বাজারমূল্য প্রায় লাখখানেক টাকা৷ যদিও সরকারি হাসপাতাল থেকে অবশ্য এগুলি বিনামূল্যেই মেলার কথা৷ কিন্তু বহুমূল্য এই সব জিনিস সব সময়ে লাগে না বলে সর্বক্ষণ মজুতও রাখা হয় না হাসপাতালগুলিতে৷ স্বাস্থ্যভবন থেকে বিশেষ অনুমতিসাপেক্ষে সেগুলি কিনতে হয়৷ ‘স্টেট ইলনেস অ্যাসিস্ট্যান্স ফান্ড’ থেকে অর্থবরাদ্দের জন্য তৈরি হওয়া সেই ফাইলটিই অভিযুক্ত পলাশ আটকে দেয় বলে অভিযোগ৷

ADVERTISEMENT
ADVERTISEMENT

ধনঞ্জয়ের অভিযোগ, ফেব্র‌ুয়ারি মাস থেকে ফাইলটির জন্য তাঁরা হন্যে হয়ে ঘুরতেন৷ কিন্তু পলাশ তাঁদের সাফ জানান, তিন লাখ টাকা তাঁকে না দিলে তিনিও ফাইলটি ছাড়বেন না৷ এবিষয়ে রোগী’র পরিবার তাদের আর্থিক অসামর্থের কথা অভিযুক্তকে জানালে তখন সেই থাকা কমতে কমতে শেষ পর্যন্ত দেড় লাখ টাকায় দাঁড়ায়৷ কিন্তু সে টাকা দেওয়ার সামর্থও ছিল না মণ্ডল পরিবারের ছিল না জেনে, তাঁর ফাইলটি অফিসে না রেখে নিজের ব্যাগে নিয়ে ঘুরতেন পলাশ৷ শেষ পর্যন্ত আর সে ফাইল স্বাস্থ্য ভবনে পাঠানোর দরকার পড়েনি৷ কারণ ২৭ এপ্রিল সকালেই মারা যান ধনঞ্জয় বাবুর ছেলে বছর ২৩ -এর তরুণ অমিত।

ADVERTISEMENT
ADVERTISEMENT
ADVERTISEMENT
ADVERTISEMENT

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *